সামাজিক সংগঠনের সামাজিক দায়

কামরুল হাসান জনি

কামরুল হাসান জনি

বছর দুয়েক আগে ঢাকার রাস্তায় ‘ক্লিন আপ ঢাকা’ কর্মসূচি পরিচালনা করতে আসে জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের একটি দল। তাদের কার্যক্রমের ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকের নজরে আসে। ব্যাপারটি আমারও নজরে পড়ে। ব্যতিক্রম লাগে তখন, যখন দেখি সুদূর জাপান থেকে আসা তরুণ-তরুণীরা ঢাকার রাস্তা থেকে ময়লা-আর্বজনা তুলে কালো ব্যাগে রাখছেন, সবাইকে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করছেন। কিন্তু পাবলিক তাদের সঙ্গে হাত লাগানোর স্থলে করছে তার উল্টো কাজ ! মোবাইল ফোন বের করে কেউ কেউ ক্যামেরাবন্দি করছে ওসব তরুণ-তরুণীদের ছবি ! এতটুকুতেই আমাদের দায়বোধ বোঝা যায়। অথচ তাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়টি আমাদের সচেতন হতে একধাপ এগিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা কি আদৌ সচেতন! সমস্যা হচ্ছে, আমাদের মধ্যে একটি গোড়ামী লক্ষ্য করা যায়। মনে মনে বলতেও দ্বিধা করিনা – ‘এ কাজ আমি করতে যাব কেন!’ -এক লাইনের বাক্যটিই প্রতিযোগিতার বিশ্বে আমাদের অন্যসব উন্নত দেশগুলো থেকে পিছিয়ে রাখছে। এটাই চরম সত্য। মূলত ওই বিদেশি দলটি তাদের কাজের মাধ্যমে আমাদের সচেতন করার পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোকে উৎসাহ প্রদানসহ এসব কাজে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করে গেছেন। তাদের দেখাদেখি বেশ কিছু সংগঠনও শহরে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। কিন্তু গ্রামে এসব করবে কে ? অথচ এখন সবচে বেশিই সামাজিক সংগঠন গ্রামাঞ্চলে। মীরসরাইয়ের কথাই ধরুন, প্রায় ২০০ সংগঠন হবে এ অঞ্চলে ! যখন কোন সংগঠনকে সাংগঠনিক উদ্যোগে খাল খনন, বাজার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা অথবা চলাচলের ভাঙ্গা রাস্তা সংস্কারের কথা বলা হয়, তখনই অনেকে হাসেন! ব্যাপারটা এমন, যেন সবকিছু সরকারিভাবেই করতে হবে। সকল কাজে শুধুমাত্র সরকারের দায় আর জনগণ হিসেবে আমাদের কোনোই দায় নেই, দায় নেই সামাজিক সংগঠনের কর্মী হিসেবেও। কিন্তু হিসাব কি তাই বলে ? খাল খনন করা থাকলে ভারী বৃষ্টিতেও বন্যার আশংকা থাকে না, বন্যা না হলে সামগ্রিক বিপর্যয় নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা আসে না। তেমনি বাজার বা বাড়ির আশপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে পরিবেশের যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় তেমনি মানুষের স্বাস্থ্যগতও উন্নতি হয়। একইভাবে সড়ক সংস্কারও তেমন, আমরাই যাতায়াতের কাজে তা ব্যবহার করি সকাল সন্ধ্যা। সামাজিক এসব কাজগুলো সংঘবদ্ধ সমাজকর্মীরা করে নিলে সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনকে বাড়তি চাপ নিতে হয় না। অথচ শত শত সামাজিক সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনগুলো নাম বিক্রি করা কাজ দেখিয়ে আর ছবি তুলে নিজেদের প্রকাশ করতেই ব্যস্ত। সরল অংকের মত সহজ কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলো যেমন ছাত্রদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করণের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না, তেমনি সামাজিক সংগঠনগুলোও সামাজিক উন্নয়নের দায় এড়াতে পারে না।

সামাজিক সংগঠন হিসেবে প্রায় সবকটি সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এক। তবে একেকটির কর্ম পরিকল্পনা একেক রকম। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ও ব্যস্ততা এখন দুটোই সংবর্ধনামুখী। সামাজিক উন্নয়ন, জনসচেতনা ও জনকল্যাণ এসব ভুলে সংবর্ধনার দৌড়ে ব্যস্ত থাকেন অনেকে। এতে চরম ব্যস্ত অতিথিরাও। যদিও ‘আমার সংবর্ধনা আমি নিব, যত খুশি কিনে নিবে !’ এটি নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায়। তবুও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সবার আগে সামাজিক গুরুত্বই বুঝতে হবে। সমাজ উন্নয়নে পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। পাশাপাশি স্বেচ্চাসেবীরা নিজেদের মধ্যে টিমওয়ার্ক, পরামর্শের আদান প্রদান, শৃঙ্খলা রক্ষা ও যোগ্য উত্তরসূরি সৃষ্টির মাধ্যমে গতিশীল রাখতে হবে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ। এসব কাজে পারিশ্রমিক না থাকায় ত্যাগের দারুণ একটি সুযোগ রয়েছে, সুযোগ রয়েছে জনসচেতনা তৈরি করারও। তবে সামাজিক কাজ করতে গেলে সমালোচনা হবেই, এটি সমাজকর্মীদের মাথায় রেখে কাজ করা উত্তম। নিজের সংগঠনের কথাই একটু করে বলি, ‘অদম্য-২০০৫’ ও অদম্য ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের নিয়মিত কার্যক্রম দেখে অনেকে ঈর্ষান্বিত হচ্ছেন, বিব্রতবোধও করছেন, কেউবা ভবিষ্যত নিয়েও দুশ্চিন্তা করছেন। নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে যেমন অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়ালেন, তেমনি পেছন থেকে সমালোচকরাও বলে যাচ্ছেন নানা কথা। সমালোচকদের চ্যালেঞ্জ করে নয় বরং সমাজকে পরিবর্তনের সুবাতাসে পরিস্কার করে নিতে অদম্য পরিবার কাজ করছে অবিরত। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এরা ব্যস্ত সর্বদা। আসল কথা হচ্ছে. এখানে বদলে দেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কেউ এমনভাবে আগে কখনো মাঠে নামেনি। রোজকার কাজ শেষ করে কতগুলো নিবেদিত প্রাণ অবসরের পুরোটা সময় এভাবে আগে কখনো কোনো সংগঠনকে দেয়নি। একেকজন সদস্য কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বাড়তি খরচ কমিয়ে নিয়েছে অনেকটাই। সেখান থেকে কিছু টাকা সংগঠনকে দান করছে। আর সে অর্থে চলছে অদম্যের কার্যক্রম। এরকম অনেকগুলো সংগঠনই বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে মীরসরাইয়ে । সেক্ষেত্রে বলতেই হয়, তরুণদের হাতেই এখন পরিবর্তনের মশাল। সংঘবদ্ধ তরুণদের ছোট ছোট সংগঠনগুলো চাইলে নির্দ্বিধায় সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে নিজ নিজ অঞ্চল, এমনকি সেসব অঞ্চলের জনগণকেও নিয়মিত সামাজিক কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে পারে। কতইবা সময় লাগে ? অবসরের মাত্র এক-দেড় ঘন্টা বন্ধুদের নিয়ে সেচ্চাশ্রমে সময় দিলেই হয়ে যায়। আর এই এক-দেড় ঘন্টাই পারে সমাজটা বদলে দিতে। সপ্তাহে বা মাসে ঘন্টা দুয়েক সময় নিলে দারুণভাবে পরিবর্তন এসে যাবে স্ব স্ব সংগঠনের। সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত একদিন উন্নয়নমুখী কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করলে শুধু ওসব সামাজিক সংগঠনই নয় ওই অঞ্চলটিও সমাদ্রিত হবে সমগ্র দেশে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোকে কয়েকটি বিষয়ে হতে হবে সচেতন । যেমন : সদস্যদের মধ্যে পদ-পদবীর লোভ পরিহার করা, ঘনঘন সংবর্ধনা, সনদ ও স্মারক প্রদান না করা, আচার-অনুষ্ঠানের লিখিত ব্যানারে অতিথির নাম উল্লেখ না করা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অবস্থা বিবেচনায় অতিথি করা। মূলত একটি সামাজিক সংগঠন যতই সামাজিক কাজ করুক না কেন, উক্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িয়ে গেলে সাংঘর্ষিক অবস্থা ও দ্রুত ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একটু পরিস্কার করে বললে বিষয়টি দাঁড়ায়, যদি কোনো সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে পদ-পদবীর লোভ থাকে অথবা পদ-পদবীর লোভে সংগঠনে যুক্ত হয়, তবে সেসকল সদস্যের সামাজিক কাজ করার মানসিকতা মোটেই থাকে না, যা করে তা লোক দেখানো! উল্টো পদ না পেলে সংগঠন ভেঙ্গে দিয়ে একের অধিক বিভক্ত সংগঠনের জন্ম দেয়ার আশংকা থাকে। যেসব সংগঠনে ঘনঘন সংবর্ধনা, সনদ ও স্মারক প্রদান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে সেসকল সংগঠনের সামাজিক কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে! যেহেতু সংবর্ধনা দেয়া তাদের মূল কাজ নয়। অন্যদিকে সনদ ও স্মারকের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। নিবন্ধিত সংগঠন হলে এসব সনদ-স্মারকের কিছুটা গুরুত্ব থাকে, অন্যথায় অনিবন্ধিত সংগঠনগুলোর বেলায় বিষয়টি খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তবে প্রকৃতার্থে অনিবন্ধিত কোনো সংগঠন সনদ ও স্মারক দিতে চাইলে তা রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তির স্বাক্ষরিত হলে উত্তম হয়। অন্যদিকে, ব্যানারে অতিথির নাম উল্লেখ করাটা এক ধরণের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তবে তা সামাজিক সংগঠনের বেলায় মাননসই নয়! বরং ব্যানারে কার্যক্রমটাই হাইলাইট হওয়া উচিত। আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অতিথি করার সময় অবস্থা বিবেচনার বিষয়টি একেবারেই স্পর্শকাতর। কারণ, এখানে নেতার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির একটা ব্যাপার থাকে। অপছন্দের কেউ পাশাপাশি চেয়ারের দাওয়াত পেলে অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতির আশংকাসহ পরবর্তীতে সংগঠনের উপর উনার সু-দৃষ্টি সরে যাবারও সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া বর্তমানে প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দলে গ্রুপিং ও একের অধিক যোগ্যনেতা থেকে থাকেন। এক্ষেত্রে একজন দাওয়া পেলে একই জায়গায় তুলনামূলক সমযোগ্যতার অন্যজন হতাশ হন। তিনি পরবর্তীতে নাও আসতে পারেন ওই সংগঠনের ভবিষ্যত অনুষ্ঠানে! এসব বিষয় সচেতন সংগঠকদের নজরে রাখা উত্তম।

সর্বোপরি, প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট মানসিক পরিবর্তন। নিজের গোড়ামী ও গতানুগতিক নিয়ম ভেঙ্গে দেয়া, নিজের মধ্যে নিজে জেগে ওঠার দুরন্ত চেষ্টাই পারে বদলে দিতে আপন ভুবন। একজন উদ্যোগী মানুষ, আর ক’জন তরুণ-যুবক পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকায় সেচ্চাশ্রমে নেমে পড়লে সমাজটা অনায়াসে বদলে দেয়া সম্ভব। এ কাজটি তরুণদের দ্বারাই সম্ভব। শুধুমাত্র গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের! একজন রাষ্ট্রের সুনাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের দেখাশোনা করাও সকলের কর্তব্য। যেহেতু রাষ্ট্র আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। সে হিসেবে সবার উচিত প্রশাসন ও সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নিজের অবস্থান থেকে রাষ্ট্রের জন্যে দায়বদ্ধ হয়ে কাজ করা। মনে রাখা উচিত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ছবি দেয়ার জন্যে যেমন আমরা পরিপাটি হই, স্মার্ট হই, তেমনি পরিবেশ সুন্দর রাখা, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সমাজ উন্নয়নে কাজ করাও একটি স্মার্টনেস।

২৬.০৮.২০১৭ইং
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।