স্মরণের দুয়ারে ইউছুপ

কামরুল হাসান জনি

Jony-pp

কামরুল হাসান জনি

বয়সের হিসাব করলে, তখন খুবই ছোট। ছোট বয়সে টিভি দেখার প্রবণতা ছিল বেশ। আমার মত অন্যদেরও হয়ত। শুক্রবার এলেই ছিল বাড়তি আগ্রহ। একে স্কুল বন্ধ, দ্বিতীয়ত বিটিভিতে প্রচারিত বাংলা ছায়াছবির ডিশুম ডিশুম। আগ্রহের মূল কারণ ছিল দ্বিতীয়টি। জুমার নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরেই শুরু হতো মিনিট-ঘন্টার হিসাব।

২০০২ সালের ৫ এপ্রিল, দিনটি ছিল শুক্রবার। সেদিনও ঠিকঠাক সময় ঘড়িতে অপেক্ষার পালা শুরু হলো। অপেক্ষার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছিল দুশ্চিন্তা। আজ কি বিদ্যুৎ আসবে না ? এমন প্রশ্ন গুলো গ্রাম-গঞ্জে ছিল মামুলি। সে হিসেবে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া স্বাভাবিক হলেও প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বলতোই। সময় ঘড়িতে টিক টিক করে চলছে সেকেন্ড-মিনিটের কাঁটা। অপেক্ষা অনবরত। হঠাৎ করে দূর হতে একটি সোর-চিৎকার কানে এলো। স্কুল ও খালের পার্শ্ব ঘেঁষে থাকা রাস্তাটি থেকে কেউ জোরে চিৎকার করলে বাড়ি থেকে ঠিক শুনতে পেতাম আমরা। সেদিনও শুনছিলাম। কান্নার আওয়াজ। এইতো, কত সর্বোচ্চ এক মিনিট! মনে হচ্ছে, সে আওয়াজ এক মিনিটও স্থায়ী ছিল না। দ্রুত বাতাসে মিলিয়ে গেছে। ঠিক মনে পড়ছে না ঝাপসা স্মৃতি থেকেও যদি বলি, একটি ছেলেকে কয়েকজন লোক কোলে-কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, দৃশ্যটি এমন হতে পারে। এখনকার মত সিএনজি’র আনাগোনাও ছিল না এলাকায়। তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বাজারের দিকে। উদ্দেশ্য হাসপাতালের। মুহুর্তের সৃষ্ট সোর-চিৎকার শেষ, সঙ্গে আমাদের ভাবনা-চিন্তাও।

মানুষ এমনই। দৃশ্যমান ঘটনার সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক থাকে। অদৃশ্য বা দূরের ঘটনাগুলো তেমন একটা আবেগি হয়না, হলেও অনুভবে নাড়া দেয় না।

late-yusuf

সন্ধ্যার ঠিক কিছুক্ষণ আগে জানতে পারি, দুপুরের সোর-চিৎকারের মূল কাহিনি। বিদ্যুৎ নেই। টেলিভিশনের বিদ্যুৎ সংযোজন তারটি এক প্রকার নষ্ট। কিন্তু বাংলা ছায়াছবি দেখার আগ্রহে ছটফট করছিল কিশোর ইউছুপ। সঙ্গে বাড়ির অন্যরাও। খুব সম্ভব তৎসামান্য ইলেক্ট্রিকের কাজ জানতো সে। তা না হলে, অতি আবেগে ! বিদ্যুৎ সংযোগ তারটি সে সারাতে চেষ্টা করছিল। কোন এক মূহুর্তে তারের একটি অংশ মুখে নিয়ে উপরের আবরণ সরাতে যাবে এমন সময় চলে আসে প্রাণ ঘাতক বিদ্যুৎ! ভুল ছিল, ভুল হলো। বৈদ্যুতিক কাজের সময় মেইন সুইচ বন্ধ রাখেনি, বন্ধ রাখেনি যেখানে কাজ করছিল সেখানকার লাইনও। শর্ট সার্কিটে আক্রান্ত হলো ইউছুপ। হৈ-চৈ হলো, লোক জড়ো হলো, সোর-চিৎকার সব হলো। শুধু হলো না দুরন্তপনা কিশোরের আর ঘরে ফেরা। হাসপাতালের চিকিৎসক জানালেন, ইউছুপ চলে গেছে না ফেরার দেশে। সে আর ফিরবেন না। শুক্রবার এলে আগ্রহ নিয়ে বাংলা ছবি দেখার বায়না করবে না। হলুদ রঙের শার্ট পরে ছোট ছোট কদমে আর যাবে না বিদ্যালয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে ক্লাস করবে না, প্রবেশ পত্র হাতে পরীক্ষা দিতেও আর যাবে না।

ইউছুপ চলে গেছে। কিশোর বয়সেই আমরা তাকে হারিয়েছি। মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। পাড়া-প্রতিবেশিরা এখন হয়তো তাকে ভুলেই গেছে। কিন্তু তার মা! মা কি ছেলেকে ভুলে থাকতে পারে। মায়ের দৃষ্টিতে কিশোর বেলার ইউছুপের ছবিখানা এখনো ফিরে আসে বার বার। ফিরে আসে সে বন্ধুদের কাছে। হয়তো গা ঘেঁষে বসে থাকে বন্ধুদের আড্ডায়। তার নাম ধরে কত কথা বলে বন্ধুরা, অথচ কেউ তাকে আর দেখে না। অদৃশ্য হয়েও দৃশ্যমান ইউছুপ ফিরে আসে। ইউছুপ ফিরে আসুক, বেঁচে থাকুক অদম্য বন্ধুদের অন্তরে। স্মরণের দুয়ারে রয়েছো বন্ধু, রবে চিরকাল।

লেখক : সহ-সভাপতি, অদম্য-২০০৫।
০৫ এপ্রিল ২০১৬ ইং